নজরুল এবং নজরুল সাহিত্যঃ জলিল সরকার

0
100

নজরুল এবং নজরুল সাহিত্যঃ
জলিল সরকার

হাজার বছরের বাঙালির ঋদ্ধ ইতিহাসের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক বাঙালির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। একজন শ্রষ্ট্রা এবং কর্মযোগী মানুষের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে একটি জাতিকে জাগিয়ে তোলেন যিনি, তিনিই নজরুল। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রবলপ্রাণ বিদ্রোহী কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
মানবতার তূর্যবাদক এক সেনানীর নাম নজরুল। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সংহত রূপের নাম নজরুল। প্রেমের অধরা মাধুরীর কথা কবিতা ও গানে শোনান যিনি, স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ান যিনি, শাস্ত্রাচার লোকাচার আর সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে কলম ধরেন যিনি, তিনিই নজরুল। কতভাবেই নজরুলকে তুলে ধরা যায়। যাকে বলব বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভা, নজরুল তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প,নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, ব্যক্তিগত রচনা, চিঠিপত্র, সঙ্গীত -কোন রূপকল্পে না লিখেছেন নজরুল!
রবীন্দ্রাথের প্রবল পরাক্রমের সময় তিনি আবির্ভূত হয়েও বাংলা কবিতায় একটা স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণে সমর্থ হয়েছেন নজরুল। আমাদের কবিতার ধারার তিনিই প্রথম শিল্পী।
মানবতাবাদী চেতনাই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় কেন্দ্রীয় সুর। সুস্পষ্ট মানববন্দনা
সমকালের সাহিত্যধারায় নজরুলকে স্বকীয় মাত্রায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। কবিতায় নজরুল মানুষকে বিবেচনা করেছেন সাম্যবাদীর দৃষ্টিতে; কোনো ভেদচিন্তা সেখানে শিকড়ায়িত হয়নি। স্মরণ করা যায় তাঁর বহুল উচ্চারিত এই পঙক্তিগুচ্ছ—-
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সবকালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জাতি। ( মানুষ, / সাম্যবাদী)
অসাম্প্রদায়িক চেতনা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বিশিষ্ট লক্ষণ।
নজরুলের সৃষ্টিচৈতন্যে সম্প্রাদায় নিরপেক্ষ এই চেতনা সদ্য সক্রিয় থাকার কারণেই উচ্চারিত হয় এমন প্রত্যয়দীপ্ত চরণগুচ্ছ–
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ/
কাণ্ডারী আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ।
নজরুল প্রচলিত ও সনাতন ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠে, কবিতার মানব ধর্মের জয়গান গেয়েছেন।
তাই স্পষ্ট করে তিনি ঘোষণা করেন –
কাটায়ে উঠেছি ধর্ম -আফিম যাজকী পেশা
ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ
ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত,
এক মানবের একই রক্ত মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা!
নজরুল কখনো ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। তিনি বিদ্রোহ করেছেন ধর্মকে নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত ধর্ম ব্যবসা করেন তাদের বিরুদ্ধে।
বস্তুত মানুষকে, মানুষের ধর্মকে তিনি বড় করে দেখেছেন আজীবন। তিনি কল্পনা করেছেন এক সাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক ভেদ; নেই আদি- জনগোষ্ঠির প্রতি কোন তুচ্ছতাবোধ–
গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশিছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান। ————-
(সাম্যবাদী, সাম্যবাদী)

মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা আর বিশ্বাস ছিল বলেই চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখেও নজরুল অবলীলায় শ্যামাসঙ্গীত রচনা আর বৃন্দাবন গীত রচনা করেছেন। লিখেছেন গজল, ব্যাখ্যা করেছেন তৌহিদের একেশ্বরতত্ত্ব।
তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করেছেন।
যেমন, তাঁর একটি বিখ্যাত কালীকীর্তনে আছে–
আমার কালো মেয়ের পায়ের নীচে
দেখে যা আলোর নাচন
মায়ের রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব
যার হাতে মরণ বাঁঁচন।।…

(বনগীতি)

নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে বাঙালির কাছে সমধিক পরিচিত। ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত অত্যাচার এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে বাংলা কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেছেন নজরুল। রোমান্টিক অনুভবে মানবতার স্বপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সত্য সুন্দর মঙ্গলের আকাঙ্ক্ষায় তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে।

বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাসে কাজী নজরুল ইসলামের অবস্থান ছিল ‘ তলের তলে’ ( Bottom of the Bottom)
নিম্নবর্ণের অভিজ্ঞতা অধীন বিদ্যা দিয়ে নয়, বাস্তবতার নিরিখেই তিনি অর্জন করেছিলেন। লক্ষ করলেই দেখা যাবে, নজরুল সাহিত্য অধস্তন বঞ্চিত দলিত ও প্রান্তবাসী জনগোষ্ঠির কথাই তীব্রভাবে চিত্রিত হয়েছে।
“মৃত্যু ক্ষুধা” উপন্যাসে এই প্রতিপাদ্য শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল- প্যাকালের মা আর মেজবৌর জীবন সংগ্রাম উপন্যাসের সঞ্চার করেছে নতুন মাত্রা।
নারীকে দেখেছেন সামাজিক লৈঙ্গিক পরিচয়ে না দেখে নজরুল দেখেছেন অতি সহজেই তিনি কবিতা, গান, কথাসাহিত্যে নারীর ব্যক্তিত্বের সন্ধান পেয়েছেন।

চলবে